জাতীয় সাধারণ সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ: স্বর্গীয় পোপ ফ্রান্সিস ২৮শে মার্চ ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে সাধু পিতরের ব্যাসিলিকায় অভ্যঞ্জন খ্রিষ্টযাগে যাজকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি আপনাদের কাছে চাইছি: এমন মেষপালক হয়ে উঠুন যার শরীরে থাকে মেষের গন্ধ, একে বাস্তব করে তুলুন, যেন পালের মাঝে এক মেষপালক।” বর্তমান জগতে মঙ্গলসমাচার ঘোষণা বিষয়ে লিখিত ‘মঙ্গলসমাচারের আনন্দ’ নামক প্রৈরিতিক পত্রেও তিনি উল্লেখ করেন, “বাণী প্রচারকগণ মেষের গন্ধ ধারণ করেন, কারণ তারা মানুষের নৈমিত্তিক জীবনেরই অংশী।” ফাদার বিকাশ রিবেরু, সিএসসি’কে নিয়ে লেখার শুরুতেই পোপ ফ্রান্সিসের উক্তিটি স্মরণে এলো কারণ এটি একজন যাজকের আধ্যাত্মিকতার শক্তিশালী তাৎপর্য ফুটিয়ে তোলে।
একজন যাজক পালের সঙ্গে থাকা মেষপালক
বাইবেলে বহুল ব্যবহৃত উপমাসমূহের মধ্যে মেষপালকের উপমা অন্যতম। বাইবেলে নেতৃস্থানীয় চরিত্রসমূহকে প্রায়ই মেষপালকের সঙ্গে তুলনা করা হয়- যিনি তাঁর পালকে পথ দেখান, রক্ষা করেন এবং যত্ন নেন। পোপ ফ্রান্সিস যখন বলেন যে পালকের দেহে মেষের গন্ধ থাকা উচিত, তখন তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে প্রকৃত নেতৃত্ব মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে। যে পালক পাল থেকে দূরে থাকে, সে তাদের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝতে পারে না।
দূরত্ব নয়, নৈকট্য
পোপ ফ্রান্সিস ‘যাজকতান্ত্রিক’ মানসিকতার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করেছেন, যা যাজককে তার পাল হতে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যাজকীয় দায়িত্ব ও নেতৃত্ব যখন ক্ষমতা, মর্যাদা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন মানুষের জীবন থেকে তারা ক্রমশ দূরে সরে যায়। পোপ ফ্রান্সিসসের এই উক্তি দূরত্বের প্রবণতার বিপরীতে নৈকট্যের উদ্দেশ্যে শক্তিশালী আহ্বান। এই আহ্বান যাজককে উৎসাহিত করে মানুষের কাছে যেতে, তাদের কথা শুনতে, অসুস্থদের সান্ত¡না দিতে এবং জীবনের কঠিন মুহূর্তে পাশে থাকতে। মানুষের নিত্যদিনের যাপিত জীবনের মাঝে থেকেই একজন মেষপালক তার পালকে সঠিক পথ দেখাতে পারেন।
ফাদার বিকাশ রিবেরু’র সাথে আমার পরিচয়
চট্টগ্রাম ডাইয়োসিসের একজন সেবাকর্মী হিসেবে আমার পথচলা ২০০৪ থেকে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। খ্রিষ্টভক্তদের পালকীয় গঠন দানের উদ্দেশ্যে প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াতে হয়েছে বান্দবানের পাহাড় থেকে বরিশালের নদী বিধৌত সমভূমিতে। বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলার বান্দরবান, থানচি, বলিপাড়া, আলীকদম, লামা, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি ধর্মপল্লীসমূহ আমার বহু যাত্রার স্মৃতি বিজড়িত স্থান। তন্মধ্যে বান্দরবান, থানচি ও বলিপাড়া ধর্মপল্লী তিনটি পবিত্র ক্রুশ সংঘের যাজকদের দায়িত্বে ন্যস্ত। সে’সুবাদে এই সংঘের অনেক যাজককে না চিনলেও, যারা এই তিনটি ধর্মপল্লীতে ২০০৪-২০২৫ সময়কালে সেবা দিয়েছেন, তাদের সকলের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে সময়ের আবর্তে। ফাদার বিকাশ রিবেরু তাদের মধ্যে বিশেষ একজন, যার সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে তারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কৃতিত্বে।
ব্যস্ত নগরী হতে দূর্গম পাহাড় – এক তরুণ যাজকের যাত্রা
২০১০ খ্রিষ্টাব্দে বান্দরবান জেলার অধীনস্ত থানচি উপজেলার শান্তিরাজ ধর্মপল্লী, থানচি’র সহকারী পাল-পুরোহিত হিসেবে যোগদান করেন ফাদার বিকাশ রিবেরু। বান্দরবান ধর্মপল্লী থেকে থানচি ধর্মপল্লীর দূরত্ব মাত্র ১৪০ – ১৪২ কি.মি. হলেও সরু, আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নীচু বিপদসঙ্কুল পথটুকু অতিক্রম করতে লোকাল বাস ও জিপ গাড়ীতে ৪.৫ থেকে ৫ ঘন্টা লেগে যেতো। পথে পার হতে হয় ২১০০ ফুট উঁচু পাহাড় নীলগিরি। ব্যস্ত নগরী ঢাকা থেকে শব্দহীন পাহাড়ী জনপদ থানচিতে হঠাৎ নিয়োগ পাওয়াটা যেকোন তরুণ যাজকের জীবনে ছন্দপতনের মতই মনে হতে পারে। তখনকার থানচি ৫০এর দশকের মত দূর্গম ও অনুন্নত না হলেও আধুনিকতার ছোঁয়াও ছিল না। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে যাজকদের বাসভবন ছিল কাঠ, বাঁশ ও টিনের একটি বাড়ী, খুবই সাধারণ – আর দশটা গ্রামীণ বাড়ীর মতই আটপৌরে। ছিল না বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, নিরবিচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়র্ক, ইন্টারনেটতো অধরা স্বপ্ন! সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ব্যাটারিতে সংগৃহীত বিদ্যুৎকে আইপিএস দিয়ে সাধারণ বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা, এন্টেনা বসিয়ে মোবাইল নেটওয়র্ক ব্যবহারযোগ্য করার মাধ্যমে তিনি ধর্মপল্লীর কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করেন প্রচন্ড নিষ্ঠার সাথে। ২০১০ এর সেই থানচিতে বিমর্ষ এক তরুণ যাজকের পরিবর্তে আমি হঠাৎ দেখেছি প্রাণচঞ্চল, উদ্যমী, বন্ধুসুলভ এক যাজককে। তার সাথে পরিচিত হয়ে, আলাপচারিতায় কখনোই মনে হয়নি থানচি তার জীবনের বিষাদময় কোন অধ্যায়, বরং মনে হয়েছে সে তার জীবনের সবচাইতে উত্তম পালকীয় ক্ষেত্রে দায়িত্ব পেয়েছেন। এমন গ্রহণীয় মনোভাব আজকাল তরুণ যাজকদের মাঝে প্রায়ই দেখা যায়না। মাত্র দু’বছর পরে নিকটবর্তী নিবেদিতা কুমারী মারিয়ার ধর্মপল্লী, বলিপাড়ায় বদলী হন ফাদার বিকাশ সহকারী পালপুরোহিত হিসেবে। বলিপাড়া থানচি উপজেলাধীন একটি ইউনিয়ন। বলিপাড়া বাজারে বাস থেকে নেমে খর¯্রােতা সাংগু নদ নৌকায় পাড় হয়ে আবার প্রায় ৩০ – ৪০ মিনিট হেঁটে পৌঁছতে হতো ধর্মপল্লীতে। এই নদ বড় অদ্ভুত – বর্ষায় বিদ্রোহী খর¯্রােতা কিন্তু শীতে বৃদ্ধের ন্যায় জীর্ণ, পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হয়! মাত্র পাঁচ বছরের পালকীয় অভিজ্ঞতার পরে তরুণ যাজক হিসেবেই তিনি থানচি ধর্মপল্লীর পালপুরোহিতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে। উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যাওয়ার পূর্বে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ’ধর্মপল্লীতেই তিনি দায়িত্ব পালন করে থানচি ও বলিপাড়া এই দুই জনপদের বহু মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছেন, শরীরে পাহাড়ি মাটি ও মানুষের গন্ধ ধারণ করেছেন। ঠিক এ’কারণেই নিবন্ধের শুরুতে পোপ ফ্রান্সিসের উক্তিটি টেনে এনেছিলাম।
অদম্য পালকীয় কর্মী
কি বাণী প্রচারে, কি সাক্রামেন্ত উদ্যাপনে, কিংবা মেষদের দেখতে ফাদার বিকাশ রিবেরুকে আমি আবিষ্কার করেছি এক অদম্য পালকীয় কর্মীরূপে। পার্বত্য এলাকায় আমার নিজের ২১ বছরের যাত্রা হলেও আমার দৌড় ছিল ধর্মপল্লী কেন্দ্র এবং কাছাকাছি কয়েকটি পাড়া পর্যন্তই। কিন্তু ফাদার বিকাশ ধর্মপল্লীর কেন্দ্রের নিশ্চিত ও সহজ জীবনে সন্তুষ্ট ছিলেন না। আট বছরের পালকীয় জীবনে তিনি প্রচুর পালকীয় যাত্রা করেছেন দুর্গম পাহাড়ী পথে। সমতলের ধর্মপল্লীর সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের ধর্মপল্লীগুলোতে পালকীয় যাত্রার কোন তুলনা দেয়া চলেনা। এখানে হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল, ঘন্টার পর ঘন্টা, পাড়ি দিতে হয় খাড়া পাহাড়, পাথরে ভরা ছড়া (পাহাড়ী ঝর্ণার পানিতে সৃষ্ট সরু নদীর মত)। কখনো নদী পাড়ি দিতে হয়েছে নৌকায়, কখনোবা গুন টেনে নিতে হয়েছে নৌকাকে। কখনোবা চোরা পাথরে বেঁধে নৌকা উল্টে যাওয়া। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোস্কা পড়ে যায়, শুকনো বিস্কুট দিয়ে মেটাতে হয় ক্ষুধা, কোন গাছের নীচে মাটিয়ে শুয়ে মেটাতে হয় পথক্লান্তি, রাত কাটাতে হয় কোন অপরিচিত জনপদে। এ’সব কিছুই দমাতে পারেনি ফাদার বিকাশের পালকীয় যাত্রা। তিন্দু, মদুকের মত সীমান্তবর্তী বহু বিপদসঙ্কুল উঁচু পাহাড়ী পাড়ায় তিনি গিয়েছেন তার মেষদের দেখতে, সেবা করতে, আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাতে। যেকোন প্রয়োজনে ধর্মপল্লী এলাকার বাইরেও থানচি বা বলিপাড়া থেকে মোটরসাইকেলে ছুটে যেতেন বান্দরবানে, যে পথে স্থানীয়রাও মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে বহু দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়। বহুবার তাকে বিপ্লবী বাহিনী, দেশীয় সেনা ও বিডিআর জওয়ানদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে, সাময়িকভাবে আটক হতে হয়েছে। কিন্তু তার কৌশল, সাহস ও বন্ধুসুলভ মনোভাব প্রতিবারই তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। অধিকন্তু, তাদের সাথে তার বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। পালকীয় যাত্রায় ঠিক কত কিলোমিটার তিনি হেঁটেছেন তার হিসাব রেখেছেন কিনা জানিনা, তবে রাখলে মনে হয় মন্দ হতো না।
ভাষা ও সংস্কৃতি ধারণ
পোপ ফ্রান্সিসের শিক্ষা – ‘যে পালক পাল থেকে দূরে থাকে, সে তাদের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝতে পারে না’ বাক্যটিকে তিনি নিজ জীবন দর্শনে রূপান্তরিত করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বেশীরভাগই ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ। তারা ‘কক্বোরক’ ভাষায় কথা বলে। আমি দেখেছি, যারা তাদের ভাষায় কিছু মনোভাব আদান-প্রদান করতে পারে, তাদেরকে তারা দ্রুত আপন করে নেয়, নিজেদের একজন ভাবে। মিশনারী ফাদার লাপ্রাদ ছিলেন ত্রিপুরাদের ভাষা শিক্ষায় সবচাইতে পারদর্শী। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী তাই তাকে লাপ্রাদ ত্রিপুরা বলেই ভাবে! ফাদার মরেচ, ফাদার ফিলিপ, ফাদার লাজারুস, তারাও ত্রিপুরা ভাষায় মনোভাব ব্যক্ত করতে পারতেন বলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাঝে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তবে আমার সেবাকালীন সময়ে নতুন প্রজন্মের যাজকদের কক্বোরক ভাষায় তেমন পারদর্শিতা দেখিনি। কিন্তু বিকাশ রিবেরু ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি ঠিক হোক আর ভুল হোক – নিঃসংকোচভাবে ত্রিপুরাদের সাথে কক্বোরক-এ কথা বলতেন। লোকেরা হাসতো ঠিকই, ভুল সংশোধন করে দিতো, কিন্তু দ্রুত আপন করে নিতো ফাদার বিকাশকে। ভাষা শিক্ষার এই গুণ যে কতটা জরুরী, তা কাটেখিস্টদের ধর্মশিক্ষা দেয়ার সময়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। আমরা যে বাঁধা কাটাতে পারিনি, ফাদার বিকাশ তা পেরেছেন। শুধু ভাষা নয়, তিনি তাদের সংস্কৃতিকে জেনেছেন, তাদের মত পোশাক পড়েছেন, উদ্যাপন করেছেন, বিপুল উদ্যমে গরাই নাচ নেচেছেন। সংস্কৃত্যায়ন বিষয়টিকে তাত্ত্বিকতা থেকে ব্যবহারিক জীবনে তিনি ধারণ করেছেন। তাই কম সময়েই তিনি পাহাড়িদের নিজের মানুষ হতে পেরেছেন। ফাদার বিকাশ খুব উৎসবপ্রিয় মানুষ – যা তাকে ত্রিপুরা সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত হতে সহায়তা করেছে।
একজন বন্ধু – যিনি সম্পর্ক তৈরী করেন
ফাদার বিকাশের সাথে সকলে সম্পর্ক ছিল জটিলতা বিহীন – সরল। তিনি একান্ত আপনজনের মতই কথা বলতে পারেন বিশপ, ভাই যাজক, ধর্মপল্লীর কাটেখিস্ট, শিক্ষক, ছোট-বড় কর্মী, বয়স্ক থেকে শিশু সকল মানুষের সাথে। তাকে যখন যুবদের সাথে দেখেছি, তখন তাকেই সবচাইতে তরুণ মনে হয়েছে। আবার যখন শিশুদের সাথে, তখন দেখেছি তার শিশু সুলভ আচরণ। বহু কাটেখিস্ট, শিক্ষক, যুবককে দেখেছি তার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে। এখনো যখন তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে যান – বহু মানুষ তাকে দেখতে ছুটে আসে। কারো হৃদয় স্পর্শ করতে না পারলে যা কখনোই সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়ও আমি দেখেছি, কোন যাজক চট্টগ্রাম থেকে বদলী হলে আমার সাথে আর যোগাযোগ থাকতো না – নিজের যোগাযোগ দুর্বলতা এর পেছনে দায়ী। তবে আমার এই দুর্বলতাকে গায়ে না টেনে ফাদার বিকাশ ২০১৭ এর পরেও আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। আমি ম-লীর সেবকাজ হতে অব্যাহতি নেয়ার পরে বহু যাজক আর যোগাযোগ রাখেননি, ফাদার বিকাশ কিন্তু নিয়মিতই যোগাযোগ রেখেছেন, আড্ডা দিয়েছেন, আজ এই লেখনীরও সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রায় চার বছর আগে যখন আমার হার্টে স্টেন্ট স্থাপনের পরে সিবিসিবি সেন্টারে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন তিনি আমার হাতে একটি খাম তুলে দিয়েছেন তার বন্ধুত্বের ভালবাসাস্বরূপ। তিনি অনুভব করতে পেরেছেন, হার্টের চিকিৎসা আমার মত ম-লীর সাধারণ সেবাকর্মীর পক্ষে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বন্ধুত্ব তৈরী ও বন্ধুত্বের দাবী মেটানোর এই দিকটাকে আমি দক্ষতা বলবো না, এটি ফাদার বিকাশের জীবনে ঈশ্বরের দেয়া অনুগ্রহ।
সৃষ্টিশীল যুব সেবাকর্মী
২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ফাদার বিকাশ রিবেরুকে চট্টগ্রাম আর্চডাইয়োসিসের সহ-যুব সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন তিনি ছিলেন বলিপাড়া ধর্মপল্লীর সহকারী পালপুরোহিত। এত দূরের ধর্মপল্লীতে অবস্থান হলেও, দায়িত্ব নিতে তিনি পিছপা হননি। আমি তখন যুব সমন্বয়কারী থাকার সুবাদে তার সৃষ্টিশীলতা ও যৌবনের উচ্ছাস কাছে থেকে দেখেছি। যেকোন কর্মসূচীতে তার উপস্থিতি যুবদের মাঝে ভিন্ন মাত্রা এনে দিতো। কারণ তিনি ছিলেন মজার মানুষ। তার কথা বলার ধরণ, নানাবিধ কৌতুক যুবদের উদ্দীপিত করতো। সম্ভবত ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় যুব দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিয়াঙে। যুব সমন্বয়কারী হিসেবে সেটি ছিল আমার দায়িত্ব পালনের শেষ বছর। তিনি স্বাগত রাত্রির জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে এলেন। তার মধ্যে ছিল ফানুস উড়ানো। তার দলবল নিয়ে সে কি আপ্রাণ চেষ্টা। ঐদিকে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি বাধা দিচ্ছিল। তবু তিনি থামছিলেন না। একটি নষ্ট হচ্ছে তো আরেকটি নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি শুধু দেখছিলাম আর হাসছিলাম। এমনই ছিলেন তিনি, যা শুরু করতেন, তাতে লেগেই থাকতেন।
খ্রিস্টভক্তদের নেতৃত্বে কাজ করার উদারতা
চট্টগ্রাম ডাইয়োসিসের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এখানে খ্রিস্টভক্তরা ম-লীর উচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব দান করেন। বিশপ যোয়াকিম রোজারিও এ’ধারা শুরু করেন যা বিশপ প্যাট্রিক ডি’রোজারিও (বর্তমানে কার্ডিনাল) এবং পরবর্তী বিশপগণও অনুসরণ করেন। আমি যখন চট্টগ্রামের যুব সমন্বয়কারী, তখন ফাদার বিকাশ ছিলেন সহকারী যুব সমন্বয়কারী। আবার একই সময়ে আমি পালকীয় সমন্বয়কারী থাকা অবস্থায় আমার পরিচালনাধীন পালকীয় সেবা দলের একজন প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী হিসেবে তিনি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। বহু যাজকই খ্রিস্টভক্তদের নেতৃত্ব গ্রহণে অস্বস্তি প্রকাশ করেন, আমি নিজেই এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার সাক্ষী। কিন্তু ফাদার বিকাশের মাঝে আমি তেমন কোন মনোভাব দেখিনি। তার হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী পালকীয় সেবা দল তথা পিএসটি’র যাত্রা শুরু হয়। তাই, তার কাছে আমার চাহিদা ছিল বেশী। অথচ তিনি তখন বলিপাড়া ধর্মপল্লীর সহকারী পালপুরোহিত আর পিএসটি’র পার্বত্য চট্টগ্রাম কার্যালয় ছিল বান্দরবানে। কিন্তু যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তিনি বান্দরবান, চট্টগ্রামে ছুটে এসেছেন, যা দায়িত্ব দেয়া হয়েছেন, সঠিকভাবে সম্পন্ন করেছেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে থানচি ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত হওয়ার পরেও আমার নেতৃত্বে সেবাকাজ করতে তার কোন সমস্যা হয়নি। সেই একই মনোভাবে তিনি সদা উৎফুল্লভাবেই কাজ করেছেন। তাই কোন তিক্ততা আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয়নি কখনো। যিশু খ্রিস্ট যেভাবে প্রভু হয়েও সকলের চাইতে ছোট হয়েছিলেন, ফাদার বিকাশ সেভাবেই তার যাজকীয় সেবাকাজকে চিত্রায়িত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন – এ’কথা নিঃসন্দেহে আমি বলতে পারি।
পরিশেষ
আরো অনেক কিছুই লেখা যায়। কিন্তু বর্তমান পেশাগত ব্যস্ততায় অনেক আগে যোগাযোগ করা হলেও লিখতে বসলাম শেষ মুহূর্তে। বহু বিষয় আর ঘটনা বাদ রয়ে গেল। অন্য কেউ হলে হয়তো পাশ কাটিয়ে যেতাম। কিন্তু ঐ’যে বললাম, ফাদার বিকাশের লেগে থাকা। পরশু রাতেও ফোন দিয়ে বললেন, যতটুকু হয়েছে ততটুকুই পাঠিয়ে দিন। তাই আর এড়িয়ে যাওয়া হলো না, শেষ মুহূর্তে ল্যাপটপ নিয়ে বসে গেলাম। ফাদার বিকাশ রিবেরুকে মহান হিসেবে উপস্থাপন করার আমার কোন তাড়না বা পরিকল্পনা নেই। আমি তাকে ত্রুটিহীন মানুষও বলবো না। রক্তমাংসের একজন মানুষ হিসেবে তিনি সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। একজন যাজক হিসেবে তিনি কতটা সফল, তা মূল্যায়ন করাও আমার পরিধিতে নয়। তবে এটুকু আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, যাজক হিসেবে তিনি এমন পালক হতে পেরেছেন যিনি তার মেষদের সঙ্গে থাকেন, তাদের জীবনাবস্থা যাপন করেন, শরীরে তাদের গন্ধ ধারণ করেন। পরমেশ্বর তাকে তাঁর জনগণের সাথে একাকার হয়ে ঈশ্বরের নিত্য উপস্থিতির মাধ্যম ও উপলক্ষ্য হতে প্রচুর পরিমাণে আশীর্বাদ করুন।







