পবিত্রভূমির খ্রিষ্টানরা দীর্ঘ সংঘাত, অনিশ্চয়তা ও বারবার ভেস্তে যাওয়া শান্তি আলোচনায় গভীরভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন যুদ্ধ নয়, শান্তি চায় বলেছেন জেরুজালেমের লাতিন প্যাট্রিয়ার্ক কার্ডিনাল পিয়েরবাতিস্তা পিজ্জাবাল্লা।
৬ আগস্ট পোপের আসিসি সফর এবং ‘গ্লোবাল হাউস অব ফ্রেন্ডশিপ অ্যান্ড হোপ’ উদ্বোধন উপলক্ষে আসিসিতে অবস্থানকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।
ইসরায়েলের আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন প্রসঙ্গে কার্ডিনাল পিজ্জাবাল্লা বলেন, অনেকেই এই নির্বাচনকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এমন নয় যে, একটি নির্বাচনেই তার সমাধান হবে। এর জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব ও নতুন মুখের প্রয়োজন রয়েছে; আর সেই সিদ্ধান্ত জনগণই নেবে।
জেরুজালেমের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, যদিও বর্তমানে নির্বিচার বোমাবর্ষণসহ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চলছে না, তবুও গাজা, পশ্চিম তীর, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে সহিংসতার দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
বারবার শান্তি আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, মানুষ এখন এতটাই হতাশ যে সত্যিকারের কোনো ইতিবাচক ঘটনাও ঘটলে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতির মধ্যেও আশার কারণ রয়েছে বলে মনে করেন কার্ডিনাল পিজ্জাবাল্লা। তিনি বলেন, গাজা, পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলে এখনো বহু মানুষ ঝুঁকি নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করছেন এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করছেন। তাঁর মতে, সমাজের ভেতরে এখনো এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সহিংসতার ‘ভাইরাস’ পুরো সমাজকে গ্রাস করতে দিচ্ছেন না।
গাজার পবিত্র পরিবার ধর্মপল্লি
ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজার পবিত্র পরিবার ধর্মপল্লি সম্পর্কে কার্ডিনাল জানান, সেখানে বর্তমানে ৫৪১ জন মানুষ রয়েছেন এবং তাদের প্রত্যেককে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তারা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন।
ধর্মপল্লিতে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করা হয়েছে এবং স্কুল পুনরায় চালুর প্রস্তুতি চলছে। যাজকদের পাশাপাশি সন্ন্যাসিনীরা শিশুদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এসব কার্যক্রমে শুধু খ্রিষ্টান শিশুরাই নয়, অন্যান্য ধর্মের শিশুরাও অংশ নিচ্ছে।
কার্ডিনাল বলেন, এমন ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের জন্য যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ একটি পরিবেশ পুনর্গঠন করা।
‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’—এই অবস্থাই সবচেয়ে উদ্বেগের
পিজ্জাবাল্লা বলেন, বর্তমানে তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো মধ্যপ্রাচ্য যেন ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় আটকে না থাকে। সমাধানের কথা বলা হলেও যদি বাস্তবে কোনো কার্যকর সমাধান না আসে, তাহলে মানুষের মধ্যে ক্রমেই অবিশ্বাস ও নৈরাশ্য বাড়বে।
তবে তরুণদের মধ্যেই তিনি ভবিষ্যতের আশা দেখেন। তাঁর ভাষায়, বয়স্করা আমাদের স্মৃতি, আর তরুণরা আমাদের আশা। তাই তরুণদের মধ্যে বিনিয়োগ করতে হবে, নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং তাদের এমন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ দিতে হবে, যা অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না।
পোপ লিও চতুর্দশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ প্রসঙ্গে পিজ্জাবাল্লা বলেন, পোপ পবিত্রভূমির পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত এবং তাঁদের প্রতি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পোপের পবিত্রভূমি সফর একদিন অবশ্যই হবে, তবে তা শান্ত ও স্থিতিশীল পরিবেশে হওয়া প্রয়োজন।
শান্তির জন্য আসিসির ঐতিহ্য
১৯৮৬ সালের ২৭ অক্টোবর পোপ দ্বিতীয় জন পল বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের আসিসিতে একত্র করে যে আন্তধর্মীয় প্রার্থনার আয়োজন করেছিলেন, তার ৪০তম বার্ষিকী সামনে রেখে পিজ্জাবাল্লা বলেন, এ উপলক্ষ যেন শুধু অতীতের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না থাকে।
তাঁর মতে, গত ৪০ বছরে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে মানবতাকে। তাই এই বার্ষিকীকে অতীতের গৌরব স্মরণ করার পরিবর্তে শান্তি, আন্তধর্মীয় সংলাপ ও মানবিক ঐক্যের নতুন যাত্রার সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।







