কমিউনিস্ট শাসনামলে আলবেনিয়ার কুখ্যাত শ্রম ও কারাগার শিবিরে ১৮ বছর বন্দিজীবন কাটানো ৯৭ বছর বয়সী কার্ডিনাল আর্নেস্ট সিমোনি সম্প্রতি সেই স্পাচ শ্রমশিবিরে ফিরে গিয়ে স্মরণ করেছেন নির্যাতিত ও নিহত বন্দিদের। সেখানে ৩১ জুলাই তিনি একটি প্রকাশ্য খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করেন। এ উপলক্ষে পোপ লিও চতুর্দশ তাঁকে একটি বিশেষ চিঠি পাঠান, যা খ্রিষ্টযাগের শেষে উপস্থিতদের সামনে পাঠ করে শোনানো হয়।
১৯৬৮ সালে মধ্য আলবেনিয়ার একটি তামা ও পাইরাইট খনিকে কেন্দ্র করে স্পাচ শ্রমশিবির প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকারের পরিচালিত এই কারাগারগুলোর মধ্যে স্পাচ ছিল সবচেয়ে কঠোর ও নির্মম শিবিরগুলোর একটি। তরুণ যাজক হিসেবে কার্ডিনাল সিমোনি তাঁর ১৮ বছরের কারাবাসের বড় একটি সময় এখানেই কাটান।
পোপ লিও তাঁর চিঠিতে কার্ডিনাল সিমোনি এবং স্পাচে নির্যাতিত ও নিহত অসংখ্য বন্দির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি লেখেন, “সুসমাচারের আলোয় আলোকিত বিবেককে বন্দি করার মতো কোনো শৃঙ্খলই যথেষ্ট শক্তিশালী নয়; এমন কোনো দীর্ঘ রাত নেই, যা প্রভু তাঁর সন্তানদের জন্য প্রস্তুত করা ভোরকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে; আর এমন কোনো গভীর কারাগার নেই, যা একজন মানুষকে ঈশ্বরের ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।”
পোপ স্পাচকে আলবেনিয়ার জাতীয় স্মৃতির “সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি” হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক স্থান, যেখানে বহু মানুষ অন্যায়ের ভারী ক্রুশ বহন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এই পাহাড়গুলোর মধ্যে যারা নির্যাতিত ও নিহত হয়েছেন, তাঁদের রক্ত সেই ভূমিকে সিঞ্চিত করেছে এবং তা বিশ্বস্ততা, সাহস ও আশার এক নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়েছে।
পোপ প্রশ্ন রাখেন, “সেই স্থান থেকে কত প্রার্থনা নিশ্চয়ই স্বর্গে উঠে গেছে! কত মিনতি হৃদয়ের গভীরে ফিসফিস করে উচ্চারিত হয়েছে! কত মানুষ, দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে, তাদের শেষ আশাটুকু ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেছে!”
স্পাচে ফিরে গিয়ে খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করার কার্ডিনাল সিমোনির সিদ্ধান্তকে পোপ লিও “খ্রিষ্টের আত্মোৎসর্গের এক সাক্ষ্য” হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, খ্রিষ্টের ক্রুশ মৃত্যুর প্রতীক থেকে জীবনের প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
কেন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সিমোনি?
১৯৬৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর, বড়দিনের আগের সন্ধ্যায়, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির আত্মার শান্তির জন্য খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করার পর কমিউনিস্ট শাসক এনভার হোজার সরকার কার্ডিনাল সিমোনিকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর তাঁকে ১৮ বছর কারাগারে থাকতে হয়। ১৯৮১ সালে মুক্তি পেলেও তাঁর ওপর থেকে সরকারের ‘জনগণের শত্রু’ হিসেবে আরোপিত তকমা সরেনি। কমিউনিস্ট শাসনের পতন পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তাঁকে নর্দমা পরিষ্কারের মতো কঠোর শ্রমেও বাধ্য করা হয়।
কারাগারের কঠিন ও প্রাণঘাতী পরিস্থিতির মধ্যেও সিমোনি তাঁর যাজকীয় সেবা বন্ধ করেননি। বরং অত্যন্ত গোপনে সহবন্দিদের জন্য খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ, স্বীকারোক্তি গ্রহণ ও পবিত্র কমিউনিয়ন বিতরণ করতেন।
স্মৃতি থেকে লাতিন ভাষায় খ্রিষ্টযাগের প্রার্থনা উচ্চারণ করতেন তিনি। রুটির ব্যবস্থা না থাকলে বন্দিদের জন্য তৈরি করা অস্থায়ী চুলায় রুটি তৈরি করতেন এবং আঙুরের রস ব্যবহার করতেন দ্রাক্ষারসের পরিবর্তে।
তিনি একবার তাঁর সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, “প্রতিবারই আমি আমার জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতাম।” তাঁর ভাষায়, কর্তৃপক্ষ তাঁকে ধরে ফেললে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হতো।
৯৭ বছর বয়সে ফিরে এলেন সেই কারাগারে
৩১ জুলাই স্পাচে অনুষ্ঠিত স্মরণীয় খ্রিষ্টযাগে কার্ডিনাল সিমোনি সেই খনিশ্রমিকের হেলমেটটি সঙ্গে নিয়ে আসেন, যা তরুণ বয়সে কারাগারে শ্রম দেওয়ার সময় তিনি ব্যবহার করতেন। একসময় যে স্থানে তাঁকে জোরপূর্বক খনিতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, ৯৭ বছর বয়সে সেই স্থানেই তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন এবং নির্যাতিত ও নিহতদের স্মরণ করেন।
২০১৬ সালের নভেম্বরে পোপ ফ্রান্সিস তাঁকে কার্ডিনাল হিসেবে নিয়োগ দেন। এর দুই বছর আগে, ২০১৪ সালে আলবেনিয়া সফরের সময় পোপ ফ্রান্সিস সিমোনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎ তাঁকে কমিউনিস্ট নিপীড়নের মধ্যেও বিশ্বাস ধরে রাখা একজন জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
পোপ লিও তাঁর চিঠিতে স্পাচের ইতিহাস ও সেখানে নিহতদের স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ধরে রাখার আহ্বান জানান।
তিনি প্রার্থনা করেন, “যারা স্পাচে নির্যাতিত ও নিহত হয়েছেন, তাঁদের জন্য আমি প্রার্থনায় যুক্ত হচ্ছি—যেন তাঁদের স্মৃতি জীবন্ত থাকে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রত্যেক মানুষের অমোচনীয় মর্যাদা, স্বাধীনতার মূল্য এবং শান্তির প্রতি অঙ্গীকারের এক স্থায়ী আহ্বান হয়ে থাকে।”
কার্ডিনাল সিমোনির জীবনের এই অধ্যায় শুধু কমিউনিস্ট নিপীড়নের এক করুণ ইতিহাস নয়; বরং চরম নির্যাতন, বন্দিত্ব ও মৃত্যুভয়ের মধ্যেও বিশ্বাস, বিবেক ও আশাকে অটুট রাখার এক শক্তিশালী সাক্ষ্য হিসেবে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।







