Thursday, May 28, 2026
spot_img
Homeআন্তর্জাতিক সংবাদপশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য হুমকির মুখে

পশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য হুমকির মুখে

কলকাতা, ১৮ মে ২০২৬: ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী বিজয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে যে উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছিল, তা খুব দ্রুতই খ্রিষ্টান ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

৪ মে’র পর গত দুই সপ্তাহে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভাজনমূলক বক্তব্যের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, রাজনৈতিক বিজয় ধীরে ধীরে জবরদস্তি ও সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ প্রয়োগের রূপ নিচ্ছে।

পথে-ঘাটে ভয়ভীতি ও হামলার অভিযোগ

প্রথম ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ভোট গণনার দিনই। উত্তর ২৪ পরগণায় একদল হিন্দুত্ববাদী কর্মী “জয় শ্রীরাম” স্লোগান দিতে দিতে হাজি আলি রেস্টুরেন্টে হামলা চালায়। গেরুয়া পতাকা হাতে তারা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এক দোকানদার বলেন, “আমরা ভীত হয়ে পড়েছিলাম। এটি কোনো বিজয় উদযাপন ছিল না, বরং ভয় দেখানো ছিল” বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে ম্যাটারস ইন্ডিয়া।

পরদিনই মুর্শিদাবাদে খ্রিষ্টান বিধবা বার্নালী চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ২৫–৩০ জন কর্মী তাঁকে যীশুর উপাসনা বন্ধ করতে এবং তাঁর বাড়ি মন্দিরের জন্য দান করতে চাপ দেয়।

৭ ও ৮ মে মাদার তেরেসা ও রাজা রামমোহন রায়ের প্রতিকৃতিতে সিঁদুর মাখিয়ে দেওয়া হয়, যা অনেকেই “বঙ্গের বিবেকের প্রতি অপমান” হিসেবে অভিহিত করেন।

একই সপ্তাহে একদল বিজেপি সমর্থক একটি মসজিদের সামনে মঞ্চ তৈরি করে উচ্চস্বরে গান ও স্লোগান প্রচার করে। স্থানীয় এক ইমাম বলেন, “নিজেদের উপাসনালয়ের সামনেই আমরা যেন উপহাসের শিকার হয়েছি।”

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ১২ মে ডোমজুরের আজাদ হিন্দ কলেজে বোরকা পরার কারণে কয়েকজন ছাত্রীকে হুমকি দেওয়া হয়। তাঁদের বলা হয়, “এটি কোনো মাদ্রাসা নয়।” তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু নারীদের মর্যাদার ওপর এই আক্রমণের নিন্দা জানান।

পরদিন উত্তর কলকাতার কাশীপুর-বেলগাছিয়া আসনের বিজেপি বিধায়ক রীতেশ ঘোষণা দেন, যারা তাঁকে ভোট দেয়নি, সেই মুসলমানদের তিনি সেবা দেবেন না।

১৭ মে বাঁকুড়ায় পাস্টর রাজীব দাসের নেতৃত্বে একটি শাখা গির্জার প্রার্থনা সভা ভণ্ডুল করা হয়। পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে, যাদের মধ্যে চারজন নারী ও একজন পুরুষ ছিলেন। পরে তাঁদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এক নারী বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রার্থনা করছিলাম। হঠাৎ তারা এসে হামলা চালায়। শিশুরাও ভয়ে কেঁদে ওঠে।”

একই দিনে বাঁকুড়ার ধর্মরাজ পল্লিতে প্রায় ২৫০ জনের একটি জনতা এক খ্রিষ্টান নেতা ও তাঁর স্ত্রীকে ধর্মান্তরের অভিযোগে মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনেকেই মদ্যপ অবস্থায় খ্রিষ্টান পরিবারগুলোর ঘরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে এবং বাইবেল নিয়ে যায়। পুলিশ তিনজনকে আটক করলেও কোনো এফআইআর দায়ের করা হয়নি।

পরদিন বিকেলে জনতার চাপের মুখে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে যাওয়া বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষদের নেতাদেরও থানার বাইরে বাধা দেওয়া হয়।

এসব ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ

নতুন বিজেপি সরকার বেশ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিয়েও সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশকে রাস্তার ওপর নামাজ বন্ধ রাখতে এবং ধর্মীয় স্থানের বাইরের লাউডস্পিকার নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদের আগে ১৯৫০ সালের আইনের আওতায় কেবল অনুমোদিত পৌর কসাইখানায় পশু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়।

রাজ্যের সর্বজনীন ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পের পরিবর্তে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ চালু করা হয়েছে, ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এছাড়া ছয় মাসের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) চালুর প্রতিশ্রুতি এবং তথাকথিত “লাভ জিহাদ” ও “ল্যান্ড জিহাদ”-এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণাও আতঙ্ক বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রশাসনিক পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ের ভয়ভীতির ঘটনাগুলোর সঙ্গে মিলে সংখ্যালঘুদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

সংযত থাকার আহ্বান

তিন দশক পুরোনো সংগঠন ‘বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক বলেন, অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

তিনি বলেন, “তাৎক্ষণিকভাবে এই সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”

সরকারের মধ্যেও অনেক ভালো মানুষ আছেন বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, সংখ্যালঘু সেলের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ সভা হয়েছে এবং বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষকে খড়গপুরে সংবর্ধনা দেওয়ার মতো উদ্যোগ পারস্পরিক আস্থা তৈরির একটি বাস্তবধর্মী প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

বহুত্ববাদের ঐতিহ্য কি টিকবে?

রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মনীষীদের হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরেই বহুত্ববাদী চেতনার জন্য পরিচিত।

মাদার তেরেসার মানবসেবাও এই ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল, যা বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছিল—প্রান্তিক মানুষের সেবাই সর্বোচ্চ ধর্ম।

কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন অনেকে।

ডোমজুরের এক শিক্ষার্থীর ভাষায়, “আমরা শুধু শান্তিতে বাঁচতে ও পড়াশোনা করতে চাই। এটা কি খুব বেশি চাওয়া?”

আজ পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুদের আর্তি মূলত সহাবস্থানের আহ্বান—রাজ্যের বহুত্ববাদী চেতনাকে রক্ষা করার আবেদন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular