Friday, April 17, 2026
spot_img
Homeসংবাদনিবেদিতপ্রাণ ফাদার লেনার্ড শংকর রোজারিও, সিএসসি-এর মহাপ্রয়াণের চল্লিশ দিন

নিবেদিতপ্রাণ ফাদার লেনার্ড শংকর রোজারিও, সিএসসি-এর মহাপ্রয়াণের চল্লিশ দিন

নিউটন মণ্ডল: নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর রেজিস্ট্রার ও খ্রিষ্টীয় সমাজের এক নিবেদিতপ্রাণ ধর্ম যাজক ড. ফাদার লেনার্ড শংকর রোজারিও, সিএসসি-এর মহাপ্রয়াণের চল্লিশ দিন পূর্তিতে খ্রিষ্টযাগ ও প্রার্থনানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তাঁর জন্মস্থান গাজীপুর জেলার রাঙ্গামাটিয়া ধর্মপল্লীর নিজ বাড়িতে।

১ আগস্ট অনুষ্ঠিত খ্রিষ্টযাগে প্রধান পৌরহিত্য করেন ফাদার লেনার্ড-এর বড় ভাই ফাদার রবি রোজারিও, ওএমআই। তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক ও গুণাবলি তুলে ধরে স্মৃতিচারণ করেন ফাদার জ্যোতি এফ. কস্তা। তিনি বলেন, ছোট সাতানী পাড়া—ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের রাঙ্গামাটিয়া ধর্মপল্লীর এক নিভৃত গ্রাম। এখানেই ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন শংকর রোজারিও—খ্রিষ্টবিশ্বাস, পারিবারিক ভালোবাসা ও ধর্মীয় অনুশাসনের এক পরিমিত পরিবেশে। নয় ভাই-বোনের সংসারে তিনি ছিলেন পঞ্চম সন্তান। তাঁর এক বড় ভাই অবলেট যাজক এবং এক ছোট ভাই পবিত্র ক্রুশ সংঘের সন্ন্যাসব্রতী। শৈশব থেকেই গির্জার বেদীসেবক ও ধর্মীয় কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণে শংকর নির্মাণ করেন তাঁর স্বপ্নের ভিত্তি—যাজক হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। ১৯৭৮ সালে তিনি বান্দুরা ক্ষুদ্র পুষ্প মাইনর সেমিনারি ও হলি ক্রস হাই স্কুলে যোগ দেন। এরপর একে একে অর্জন করেন মাধ্যমিক (১৯৮৪), এইচএসসি (১৯৮৬, নটর ডেম কলেজ), বিএ (১৯৮৮), দর্শন ও ঐশতত্ত্বে স্নাতকোত্তর (১৯৯1-১৯৯৭, পুনে), মাস্টার্স (২০০৬, শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র) এবং পিএইচডি (২০১৬, ইউনিভার্সিটি অব সান্তো থমাস, ফিলিপাইন)। এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ছিলেন মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও আত্মনিবেদিত।

১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পবিত্র ক্রুশ সংঘে প্রথম ব্রত গ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালের ২ জানুয়ারি যাজক অভিষেকের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর পূর্ণাঙ্গ যাজকীয় যাত্রা। তাঁর কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল দেশ ও বিদেশ জুড়ে—পীরগাছা, বান্দরবান, জলছত্র, লক্ষ্মীবাজার, শিকাগোসহ নানান ধর্মপল্লী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তিনি নটর ডেম কলেজের ছাত্র পরিচালক, ক্লাব মডারেটর, শিক্ষক এবং উপাধ্যক্ষ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেন শিক্ষাঙ্গণের প্রেরণাদায়ী এক আলোকবর্তিকা।

তিনি আরও বলেন, ফাদার শংকর ছিলেন এক প্রকৃত যুবমনা ফাদার”। আমেরিকা থেকে ফিরে তিনি জাতীয় চ্যাপলেইন হিসেবে যুক্ত হন বাংলাদেশ ক্যাথলিক স্টুডেন্টস মুভমেন্টের সঙ্গে। তাঁর হাত ধরেই শ্রীমঙ্গল বিসিএসএম-এর পথচলা শুরু হয়।

তাঁর সাংস্কৃতিক আগ্রহ, গান, নাটক, খেলাধুলা ও পারফর্মিং আর্টসে উৎসাহ ছিল লক্ষণীয়। শিক্ষার্থীদেরও এসব বিষয়ে সক্রিয় করে তুলতে তিনি সদা আগ্রহী ছিলেন।

ছিপছিপে গড়ন, সরল জীবনযাপন, বন্ধুবৎসল আচরণ এবং উন্মুক্ত হৃদয়ের অধিকারী ফাদার শংকর সহজেই সবার প্রিয় হয়ে উঠতেন। বিশেষ করে দীন-দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল আন্তরিক ও বাস্তব। তিনি দুঃস্থদের পাশে থেকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের জুনে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে তিনি ব্যাংককে যান, এবং সেখানে ক্যান্সার ধরা পড়ে। বিভিন্ন সময় চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যাংকক, চেন্নাই ও ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকেও শেষ পর্যন্ত ২১ জুন ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ সকাল ৮:৪৫ মিনিটে পরপারে যাত্রা করেন এই মহান যাজক।

তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছে ঢাকার সেন্ট জন মেরী ভিয়ান্নী হাসপাতালে। ফাদার লেনার্ড শংকর রোজারিও, সিএসসি ছিলেন একজন সত্যিকারের আত্মত্যাগী মেষপালক, বুদ্ধিমান শিক্ষক, যুবদের বন্ধু, এবং সাধারণ মানুষের পথপ্রদর্শক

খ্রিষ্টযাগ শেষে সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান সংগঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফাদার রবি, রোজারিও। এতে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফাদার প্যাট্রিক ড্যানিয়েল গ্যাফনি, সিএসসি, ফাদার লিটন হিউবার্ট গমেজ, সিএসসি, ফাদার অজিত কস্তা, ওএমআই, পিটার রতন কোড়াইয়া, ফাদার জনি, ওএমআই, ব্রাদার নিপু রোজারিও, সিএসসি প্রমুখ স্মৃতিচারণ করেন। বক্তারা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ফাদার শংকরের চলে যাওয়ায় বাংলাদেশ খ্রিষ্টমণ্ডলী ও হলি ক্রস যাজক সংঘ হারিয়েছি এক আলোকিত মানুষ, কিন্তু তাঁর কর্ম, দৃষ্টান্ত ও ভালোবাসা আমাদের পথ দেখাবে বহুদূর পর্যন্ত।  চিরশান্তিতে বিশ্রাম করুন প্রিয় ফাদার শংকর

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular