ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, গভীর প্রার্থনা এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সাভারের কমলাপুর প্রার্থনাগৃহে উদযাপিত হয়েছে মহান সাধু আন্তনীর পর্ব। ১২ জুন অনুষ্ঠিত এ পর্বে অংশ নিতে সাভারসহ আশপাশের বিভিন্ন ধর্মপল্লী ও প্রার্থনাকেন্দ্র থেকে হাজার হাজার খ্রিষ্টভক্ত সমবেত হন।
পর্বদিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল মহাখ্রিষ্টযাগ, যা কমলাপুর প্রার্থনাগৃহ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। খ্রিষ্টযাগে প্রধান পৌরহিত্য করেন ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ, ওএমআই। তাঁর সঙ্গে সহ-পৌরহিত্যে অংশ নেন বিভিন্ন ধর্মপল্লীর ফাদারসহ অন্যান্য স্থান থেকে আগত ফাদারগণ।
সাধু আন্তনীর পর্ব উপলক্ষে আয়োজিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, বিভিন্ন ধর্মীয় সংঘের ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার, এবং বিপুল সংখ্যক সাধু আন্তনীর ভক্তবৃন্দ।
খ্রিষ্টযাগে প্রদত্ত উপদেশে আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ, ওএমআই সাধু আন্তনীর জীবন, কর্ম এবং আধ্যাত্মিক আদর্শের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধু আন্তনী ছিলেন একজন অসাধারণ ধর্মপ্রচারক, যিনি তাঁর জীবন, জ্ঞান ও প্রার্থনার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে ঈশ্বরের পথে পরিচালিত করেছিলেন।
আর্চবিশপ বলেন, “খ্রিষ্টবিশ্বাস ও খ্রিষ্টপ্রেম ছিল সাধু আন্তনীর জীবনের অন্যতম প্রধান শক্তি। যীশু খ্রিষ্টের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তাই আমাদেরও উচিত যীশুর সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সেই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের বিশ্বাসকে আরও সমৃদ্ধ করা।”
তিনি আরও বলেন, সাধু আন্তনীর জীবন শুধু শ্রদ্ধা করার বিষয় নয়; বরং তাঁর আদর্শকে দৈনন্দিন জীবনে ধারণ করে খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবনযাপন করাই প্রকৃত ভক্তির পরিচয়।
ধর্মপল্লীর পাল-পুরোহিত ফাদার অমল ডি’ক্রুজ পর্ব উপলক্ষে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “মহান সাধু আন্তনীর পর্ব আমাদের জন্য কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আমাদের বিশ্বাসকে নবায়ন করার, প্রার্থনায় আরও গভীর হওয়ার এবং ঈশ্বরের প্রেমে নিজেদের উৎসর্গ করার একটি বিশেষ সুযোগ। সাধু আন্তনীর জীবন আমাদের শেখায় বিনয়, আত্মত্যাগ, ঈশ্বরের বাক্যের প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার শিক্ষা।
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এই আনন্দঘন দিনে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই, যিনি সাধু আন্তনীর মধ্য দিয়ে আমাদের বিশ্বাসের পথে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। আমি আশা করি, এই পর্বে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক খ্রিষ্টভক্ত সাধু আন্তনীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের পরিবার, সমাজ ও গির্জার জীবনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। প্রার্থনা করি, ঈশ্বরের আশীর্বাদ ও সাধু আন্তনীর মধ্যস্থতা আমাদের সকলের জীবনে শান্তি, আশা এবং আধ্যাত্মিক শক্তি বয়ে আনুক।’”
খ্রিষ্টযাগে অংশগ্রহণকারী মিঠু গমেজ তাঁর অনুভূতি জানিয়ে বলেন, “প্রতি বছরই আমি গভীর ভক্তি ও আন্তরিকতার সঙ্গে সাধু আন্তনীর পর্বে অংশগ্রহণ করি। এই পর্ব আমার বিশ্বাসের জীবনকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে এবং ঈশ্বরের আরও নিকটবর্তী হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। আজকের খ্রিষ্টযাগে অংশ নিয়ে আমি বিশেষভাবে আধ্যাত্মিক শান্তি ও আনন্দ অনুভব করেছি।
খ্রিষ্টযাগ শেষে উপস্থিত অতিথিদের সংক্ষিপ্তভাবে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় সংসদ সদস্য আন্না মিনজ তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের খ্রিষ্টান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “আমি বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সমাজ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব নিয়ে জাতীয় সংসদে কাজ করছি। আমি সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আমার দায়িত্ব পালন করে যেতে চাই। এ জন্য আমি আপনাদের প্রার্থনা ও সহযোগিতা কামনা করছি।”
দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান, প্রার্থনা ও ভক্তিমূলক আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত এই পর্বে অংশগ্রহণকারী খ্রিষ্টভক্তরা সাধু আন্তনীর মধ্যস্থতায় ঈশ্বরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা, ভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্বাসের এই মিলনমেলা কমলাপুরের খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে বলে অংশগ্রহণকারীরা অভিমত ব্যক্ত করেন।







