Friday, April 17, 2026
spot_img
Homeআন্তর্জাতিক সংবাদ৩৩তম জাতীয় খ্রিস্টান লেখক কর্মশালা ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৩৩তম জাতীয় খ্রিস্টান লেখক কর্মশালা ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

“কলম হোক সুসমাচারের বাহক, শব্দ হোক পরিবর্তনের কারিগর,” এই মূলভাবকে প্রতিপাদ্য করে এপিসকপাল যুব কমিশন খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্রের সহায়তায় গত ২৫-২৮ মার্চ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, আরএনডিএম রিনিউয়াল সেন্টার, মোহাম্মদপুর, ঢাকায় চার দিন ব্যাপী ৩৩তম জাতীয় খ্রিষ্টান লেখক কর্মশালার আয়োজন করেছে। উক্ত কর্মশালায় বাংলাদেশের আটটি ধর্মপ্রদেশ এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন গঠনগৃহ ও সেমিনারি থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ২৬ জন যুবক, ২০ জন যুবতী ও ৩ জন ব্রতধারীসহ মোট ৪৯ জন অংশগ্রহণ করেছে।

প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে ৩৩তম জাতীয় খ্রিষ্টান লেখক কর্মশালার যাত্রা শুরু হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোর্স পরিচিতি ও নিয়মাবলী, প্রাক-প্রশিক্ষণ ধারণা ও প্রত্যাশা’ বিষয়ে সহভাগিতা করেন শ্রদ্বেয়া সিস্টার চম্পা রোজারিও, এমপিডিএ, অফিস সহকারি, এপিসকপাল যুব কমিশন । উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এপিসকপাল যুব কমিশনের নির্বাহী সচিব ও জাতীয় যুব সমন্বয়কারী ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি সকল অংশগ্রহণকারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন: “ঈশ্বর প্রদত্ত অনুগ্রহের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তি একজন স্বতন্ত্র লেখক, যা তাদের অধ্যয়ন, দর্শন, চিন্তা ও গবেষণামূলক ভাষার সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন।” উদ্বোধনী খ্রিষ্টযাগের উপদেশে ফাদার বিকাশ বলেন, আজ পবিত্র আত্মা তোমাদের মধ্যে অধিষ্ঠান করছেন, তিনিই তোমাদের কল্পনাশক্তিকে পবিত্র করে নতুন নতুন ধারণা ও উদ্দীপনা তৈরি করে “রাইটার্স ব্লক” (জড়তা কাটিয়ে) সৃজনশীল শব্দের প্রবাহে  অত্যন্ত গভীর ভূমিকা রাখবেন।”

দ্বিতীয় দিনে স্বাধীনতা দিবস উপলেক্ষে বিশেষ প্রার্থনা ও পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করা হয়। সকালে প্রথম অধিবেশনে ওয়াইএমসি-এর সাধারণ সম্পাদক মি: মানিক উইলভার ডি’কস্তা “লেখালেখি সুন্দর আর্ট, নান্দনিক শিল্প, দর্শন ও গবেষণার ফসল” মূলভাবের উপর বাস্তবমুখী উপস্থাপনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “লেখক হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি বিভিন্ন লেখার ধরণ এবং কৌশলে লিখিত শব্দ ব্যবহার করে ধারণা প্রকাশ করেন, অনুভূতি এবং আবেগকে অনুপ্রাণিত করেন।” দ্বিতীয় অধিবেশনে “খ্রিষ্টীয় সাহিত্য ও খ্রিষ্টীয় অনুবাদ সাহিত্যঃ বাইবেলীয় পুস্তক লেখার ধরণ ও উদ্দেশ্য” মূলভাবের উপর উপস্থাপনা করেন ফাদার প্যাট্রিক শিমন গমেজ, পাল-পুরোহিত, কেওয়াচলা ধর্মপল্লী। তিনি পবিত্র বাইবেলের বাংলা অনুবাদ ও বাইবেল কিভাবে লিখা হয়েছিলো, বঙ্গানুবাদে ও বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নে খ্রিষ্টানদের অবদান এই বিষয়ে খুবই সুন্দরভাবে সহভাগিতা করেন। ঐ দিনের বিকালের অধিবেশনে  “খবর, রিপোর্ট, স্পট রিপোর্ট ও ফিচার লেখা, হাতে-কলমে খবর লিখন, ফিচার/রিপোর্ট/ সংবাদ উপস্থাপনা ও মূল্যায়ন” এ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন মি: শরীফ হোসেন হৃদয়, সিনিয়র সাংবাদিক, চ্যানেল আই।  তিনি বলেন, “লেখালেখি একটা সৃজনশীল কাজ। রিপোর্টিং একটা চমৎকার আর্ট এবং নান্দনিক শিল্প।” সন্ধ্যায় পবিত্র খ্রিষ্টযাগের উপদেশে সিবিসিবি সেন্টারের পরিচালক ফাদার তুষার জেমস গমেজ বলেন, “একজন খ্রিষ্টান লেখক হিসাবে তোমাদের চিন্তায়-অনুভূতিতে থাকবে ঈশ্বর, হৃদয়ে থাকবে যীশু ও কন্ঠে থাকবে পবিত্র আত্মা।”

তৃতীয় দিনের সকালে এপিসকপাল যুব কমিশনের সভাপতি পরম শ্রদ্ধেয় সুব্রত বনিফাস গমেজ পবিত্র খ্রিষ্টযাগ উৎসর্গ করেন ও অর্থপূর্ণ উপদেশবাণী রাখেন। তিনি বলেন, “পবিত্র আত্মাই বাইবেলের মূল্যবোধের পক্ষে আপসহীনভাবে লিখতে ও  লেখক হিসাবে তোমাদের আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন, যাতে তোমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও তোমাদের লেখা একে অপরের পরিপূরক হয়।” সকালের প্রথম অধিবেশনে মূলসুরের উপর: “কলম হোক সুসমাচারের বাহক, শব্দ হোক পরিবর্তনের কারিগর” অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক সেশন পরিচালনা করেন ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি। তার সারসংক্ষেপ: “পবিত্র আত্মা একজন স্বর্গীয় নির্দেশক হিসেবে লেখকের চিন্তাধারাকে সত্য ও সৌন্দর্যের পথে পরিচালিত করেন এবং তিনিই একজন খ্রিষ্টান লেখকের কলমকে কেবল একটি যন্ত্র থেকে “জীবন্ত সাক্ষ্যে” রূপান্তরিত করতে সহাতয়তা করবেন।” ঐ দিনের দ্বিতীয় সেশন: “বাংলা বানানের রীতি ও শব্দ উচ্চারণের কৌশল” এর উপর খুবই চমকপ্রদ ও স্বাবলীলভাবে উপস্থাপন করেন নটর ডেম কলেজের প্রভাষক ও আবৃত্তিকার ড. তিতাস ভিনসেন্ট রোজারিও।  দুপুরে অংশগ্রহণকারীদের বাস্তাবভিক্তিক বিভিন্ন বিষয়ে রির্পোট তৈরি করতে মাঠ পরিদর্শনে পাঠানো হয়। তৃতীয় অধিবেশনে সন্ধ্যায় “খ্রিষ্টীয় গান লেখা ও সুর করার কৌশল” সমন্ধে উপস্থাপনা ও তার সংগ্রামী জীবন সহভাগিতা করেন বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার লিটন অধিকারী রিন্টু।  রাতের অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীগণ মাঠ পরিদর্শনে সংগৃহীত তাদের দলীয় প্রতিবেদন ও ফিচার গুগল স্লাইডের মাধ্যমে অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করেন। অত:পর মানসম্মত ছবি তোলা বিষয়ে ধারণা, শর্ট ফিল্ম ও মোবাইল রিপোর্ট তৈরি করার কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ধারণা প্রদান করেন ফ্লেবিয়ান ডি’কস্তা ।

চার দিন ব্যাপী কর্মশালায় চতুর্থ দিন অংশগ্রহণকারীদের খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্র পরিদর্শনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে “এডিটিং, প্রুফ রিডিং, সম্পাদকীয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাণী” লেখা সম্বন্ধে সুন্দরভাবে ধারণা প্রদান করেন, সাপ্তাহিক প্রতিবেশীর সম্পাদক ও সেন্টারের পরিচালক ফাদার বুলবুল আগষ্টিন রিবেরু ও তার সহকর্মীবৃন্দ। পরবর্তীতে খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্রের কার্যক্রম, কর্ম পরিধি, বিভিন্ন সেক্টর যথা: সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, জেরি প্রিন্টিং প্রেস, প্রতিবেশী প্রকাশনী, জ্যোতি কমিউনিকেশন বাণীদীপ্তি ও রেডিও ভেরিতাস এশিয়ার কার্যক্রম পরিদর্শন করা হয়। উপরিউক্ত অধিবেশন ছাড়াও  এই কর্মশালায় ছিল নিয়মিত প্রার্থনা ও খ্রিষ্টযাগ, দলীয় কাজ ও সহভাগিতা ও বিভিন্ন প্রতিবেদন উপস্থাপনা। এবারের কর্মশালায় ব্যতীক্রম ছিল বিকালে বাংলাদেশ খ্রিস্টান লেখক ফোরামের আমন্ত্রিত সদস্যদের পরিচালনায় সম্মানিত সাহ্যিতিক ও সাংবাদিক মি: বিধান রিবেরু, ফাদার বুলবুল আগষ্টিন রিবেরু, মহামান্য কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও, সিএসসি’র সাথে অংশগ্রহণকারীদের পরিচিতি, চেতনা ও ভাব আদান-প্রদান এবং নতুন লেখকদের লেখা দিয়ে বই ও বিশেষ পত্রিকা প্রকাশের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ। অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের প্রতিত্তোরে মি. বিধান রিবেরু বলেন, “কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার চৌর্যবৃত্তিকে ছাপিয়ে লেখকের নিজস্ব বুদ্ধিদীপ্ততাকে আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার সাথে সংযুক্ত করে সার্বজনীনভাবে সত্যগুলোকে উন্মোচিত করাই নতুন লেখক হিসাবে তোমাদের দায়িত্ব।” শেষান্তে  অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে ‘একজন লেখকের কী কী গুণাবলী, আদর্শ ও মূল্যবোধ থাকা আবশ্যক’ সে ব্যপারে প্রধান অতিথিসহ সম্মানিত সকল অতিথিগণ অনুপ্রেরণামূলক কিছু কথা বলেন তাদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন।

পরিশেষে মহামান্য কার্ডিনাল মহোদয় সমাপনী খ্রিষ্টযাগ  উৎসর্গ করেন। প্রশিক্ষণের পর রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের আনুষকা লরেনদিয়া সেরাও অনুভূতি প্রকাশ করেন যে, “লেখালেখি কেবল যে একটি শখ নয়, বরং এটি একটি ‘কলিং’ বা ঈশ্বরদত্ত সেবা সেটা বুঝতে পেরেছি। আমি এই কর্মশালায় আমার কলমকে সুসমাচার প্রচার এবং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখার এক নতুন উদ্দীপনা পেয়েছি।” চট্টগ্রামের ইম্মানূয়েল অনিন্দ ডায়েস বলেন, “আমি অন্যান্য সমমনা যুবা লেখকদের সাথে পরিচয় হওয়ায় আমার একাকীত্ব দূর হয়েছে। “আমি একা নই, আরও অনেকে একই লক্ষ্যে কাজ করছে” এই অনুভূতি আমাকে প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত করেছে। আমি এই কোর্স থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে (যেমন: কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প বা ব্লগ) চিন্তা করতে শিখেছি। নতুন টেকনিক এবং সৃজনশীল আইডিয়াগুলো আমার সামনে লেখালেখির এক বিশাল জগত উন্মোচন করে দিয়েছে।” ময়মনসিংহের শ্রেয়া মানখিনের অভিব্যাক্তি: “প্রশিক্ষণ শেষে আমার মধ্যে একটি ইতিবাচক চাপ বা দায়িত্ববোধ কাজ করছে। আমি বুঝতে পারছি যে, একজন খ্রিষ্টান লেখক হিসেবে সত্য প্রকাশ করা এবং নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা আমার বড় দায়িত্ব। সমাজ ও মণ্ডলীর প্রতি আমারও যে দায়বদ্ধতা আছে, তা আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো: পবিত্র আত্মার সহায়তায় আমার সাধারণ শব্দগুলোও যে অন্যের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে তা আমার জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা।” অতপর শ্রদ্ধেয় ফাদার বিকাশ সবার উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, “আমার বিশ্বাস, কোর্সের মাধ্যমে তোমরা একজন সৎ ও নিবেদিত লেখক হয়ে সত্যের অনুসন্ধানে নতুন দর্শনের আলোকবর্তিকা জ্বালাতে লেখনীর হাতকে আরো শাণিত ও সবল করে তুলতে পারবে ।” গ্রুপ ছবি তোলার পর কার্ডিনাল মহোদয় যুবা লেখকদের আশীর্বাদ দিয়ে ৩৩তম জাতীয় খ্রিষ্টান লেখক কর্মশালা ২০২৬ এর সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular